রাজস্ব ভবনে প্রাক-বাজেট আলোচনা

কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা নিশ্চিতের দাবি অর্থনীতিবিদ ও নীতিপরামর্শকদের

রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর তোড়জোড় থেকে তৈরি হয় এক ধরনের অন্যায্য কর ব্যবস্থা।

টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া ও করভারকে করদাতার আয় ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে প্রয়োজন ন্যায্য কর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য কর রাজস্ব আহরণ পদ্ধতিটিরও সহজীকরণ দরকার। কমিয়ে আনতে হবে ন্যূনতম করের আওতাও।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট সভায় অর্থনীতিবিদ ও নীতিপরামর্শকদের নয়টি সংস্থার প্রতিনিধিদের আলোচনায় এমন বক্তব্য উঠে আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়োজনে এ সভায় অংশ নেয় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (বিইএ), ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি), বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিড ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড), অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), এসএমই ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) এবং ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (বিইআর)। এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

সভায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ও সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফর্মের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে অর্থ পাচার রোধে ডিজিটাল সেবায় করনীতি সংস্কারের দাবি জানানো হয়। সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, ‘আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে কর আদায় করা উচিত। এজন্য ডিজিটাল ট্যাক্সের ভিত্তিটাকে আরো বাড়ানো যায়। বাংলাদেশে অনেকেই এখন মেটা বা গুগলের নানা সেবা কিনছেন। এখানে যে সেবা কিনতে ৫ ডলার ৭৫ সেন্ট ব্যয় হয়, তার মধ্যে ৭৫ সেন্ট আমি অন্য দেশকে ট্যাক্স দিচ্ছি, বাংলাদেশকে না। যদিও সেবাটি আমি ক্রয় করছি বাংলাদেশে বসে। এখন খুঁজে দেখতে হবে এখান থেকে কী পরিমাণে এ সেবা কেনা হচ্ছে। গুগলকে বলতে হবে ট্যাক্স দাও। এসব আন্তঃসীমান্ত লেনদেন থেকে একদম ক্ষুদ্র আকারে যতটুকু যায়, শুরু করা হোক।’

সিপিডির পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপনের সময় সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তামিম আহমেদ বলেন, ‘সাধারণত রাজস্ব আহরণ কমে গেলে তা বাড়ানোর যে তোড়জোড় দেখা যায়, তা থেকে এক ধরনের ট্যাক্স ইনজাস্টিস হয়। কর ন্যায্যতার জন্য চারটি স্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, যা আহরণ হচ্ছে, তার ন্যায্য বণ্টন হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, কর কাঠামোর পশ্চাৎমুখী (রিগ্রেসিভ) উপাদানগুলোকে কমিয়ে এনে এটিকে যতটা সম্ভব প্রগতিমুখী (প্রগ্রেসিভ) করা। এর পরই রয়েছে রাজস্ব অপচয় (লিকেজ) দূর করা। সবশেষে কার্যকর কর ব্যবস্থার জন্য এনবিআরকে আরো শক্তিশালী করা।’

সিপিডির প্রস্তাবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য বিদ্যমান একক (ফ্ল্যাট) হ্রাসকৃত করহার সংস্কার করে তা পারফরম্যান্সভিত্তিক বা শর্তসাপেক্ষ প্রণোদনায় রূপান্তর করা উচিত বলে অভিমত দেয়া হয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এক্ষেত্রে পারফরম্যান্সভিত্তিক কর সুবিধা দেয়া যেতে পারে। বৈশ্বিকভাবে আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ের ওপর কর ছাড়ের মতো কিছু সুবিধা দেয়া হয়। কিন্তু শেয়ারবাজারে কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসছে না দীর্ঘদিন ধরে।

বিল্ডের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকার ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ধার নিয়েছে। একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য বেড়েছে, অন্যদিকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালু রয়েছে। বাজেটে প্রাক্কলন ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। আবার উচ্চ সুদহার এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে আয়কর খাতে কর রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি সহজীকরণ, আয়কর আইনের পৃথক ধারায় উৎসে কর্তনকৃত করের জন্য রিফান্ড ব্যবস্থার সুস্পষ্ট উল্লেখ, ন্যূনতম করের আওতা কমিয়ে আনা এবং মূসক খাতে ভ্যাটের একক হার ১০ শতাংশ নির্ধারণসহ বেশকিছু প্রস্তাব দেয়া হয়।

এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের জন্য অগ্রাধিকারমূলক কর ব্যবস্থা (প্রেফারেন্সিয়াল ট্যাক্স রেজিম) প্রবর্তনের ওপর জোর দেয়া হয়। এছাড়া যেসব এসএমই প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত, তাদের ভ্যাট রিটার্ন প্রতি মাসের পরিবর্তে ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে জমা দেয়া; নতুন এসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত টার্নওভার বা গ্রস রিসিপ্টের ওপর কোনো ন্যূনতম কর আরোপ না করা এবং শিল্পের কাঁচামালসহ যেকোনো পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ২ শতাংশে নামিয়ে আনাসহ আরো বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘ভ্যাট কমিয়ে দিলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে বলে এমন একটি বক্তব্য উঠে এসেছে। কিন্তু এখানে তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। কারণ ভ্যাট যদি দশমিক ৫ শতাংশও কমানো হয়, তাহলে যারা নন-কমপ্লায়েন্ট তারা কিন্তু এ টাকাটা পরিশোধ করবেন না।’

তিনি আরো জানান, এসএমই খাতকে সুযোগ-সুবিধা দিতে একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম করা হবে।

এর আগে সকালে রাজস্ব ভবনে আরেকটি প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিরীক্ষণ, আইনজীবী, বাণিজ্য খাতের শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ও ইনডেন্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ১২টি পেশাজীবী সংগঠন অংশ নেয়।

আরও